Friday, February 12, 2016

পুলিশের ‘গায়ের জোরেই’ ‍উচ্ছেদ সেই ৪০ পরিবার


যশোর: সরকারি জমি বরাদ্দ নিয়ে বসবাসকারী সেই ৪০টি পরিবারকে উচ্ছেদ করলো পুলিশ। শুক্রবার দিনভর এই পরিবারগুলো চোখের জলে ভেসে তাদের বাড়ি ঘর ছেড়ে গেছে। পুলিশের অব্যাহত হুমকির পর তারা চেলে যেতে বাধ্য হলেন। যদিও ওই জমি দখলে নিয়ে সেখানে তিন-চার দিন আগে লাগানো হয়েছে পুলিশ ক্লাবের সাইনবোর্ড।

শুক্রবার গাড়িখানা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পরিবারগুলো তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলছে। আসবাবপত্রসহ বাড়ির জিনিসপত্র নিয়ে চলে যাচ্ছে। এর পেছনের অংশে পুলিশি প্রহরায় চলছে দেয়াল নির্মাণের কাজ।
উচ্ছেদের শিকার হালিমা খাতুন জানালেন, ১শ’ বছর ধরে তার পূর্বপুরুষরা এই জমি বরাদ্দ নিয়ে বসবাস করে আসছেন। হঠাৎ করে পুলিশ এই জমি তাদের দাবি করে হুমকি ধামকি দিয়ে চলে যেতে বলেছে। তারা সব জায়গায় দেনদরবার করেছেন, সময় চেয়েছেন। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।

অশ্রুসিক্ত আরেক গৃহবধূ সালমা বেগম জানালেন, ভয়-আতঙ্কে গত তিনদিন ধরে তাদের কোনো খাওয়া নেই। সকাল-বিকেল পুলিশ এসে হুমকি দিয়ে জায়গা খালি করতে বলছে। তাই তারা চলে যাচ্ছেন।

নাম না প্রকাশে কয়েকজন জানালেন, পুলিশের হুমকি-ধামকির মধ্যেও পরিবারগুলো সেখানে থাকতে চেয়েছিলো। কিন্তু বুধবার রাতে ট্রাফিক অফিসের সামনে ‘বোমাবাজি’র ঘটনায় এই জমির বাসিন্দাদের নামে মামলা করা হয়েছে। এখন হুমকি দেয়া হচ্ছে জায়গা খালি না করলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। আর উল্টো মামলা করা হবে। এই অত্যাচারের ঘটনায় তাদের পাশে যারা দাঁড়াচ্ছে পুলিশ তাদেরও হুমকি দিচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে তারা বাড়ি ঘর ছাড়ছেন।



ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, ১৯১০ সালে ১২০ শতক সরকারি জমি বরাদ্দ নিয়ে গোপী নাথ রায় চৌধুরী, মাসুদ আলম, আসাদুজ্জামান শিপলুসহ বেশ কয়েকজন বংশানুক্রমে ভোগ দখল করে আসছেন। কিন্তু জেলা প্রশাসন থেকে বরাদ্দ দেয়া জমিটি নিজেদের দাবি করে পুলিশ। এক পর্যায়ে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। কিন্তু বিচারিক আদালতে পুলিশ হেরে যায়। বর্তমানে মামলাটি জেলা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু চারদিন আগে রাতের অন্ধকারে এই জমিতে থাকা দোকান ও আবাসিক ভবন থেকে বাসিন্দাদের উচ্ছেদে নামে পুলিশ। রাতের আঁধারে পুলিশ রাস্তা সংলগ্ন প্রায় ১০টি দোকান দখল করে দেয়াল তুলে টাঙিয়ে দেয় পুলিশ ক্লাবের সাইনবোর্ড। এরপর আবাসিক ভবন থেকে বাসিন্দাদের নামিয়ে দিতে শুরু হয় হুমকি-ধামকি।

বৃহস্পতিবার এসব ঘটনা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সংবাদ সম্মেলন করলে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলামেইলসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়। কিন্তু কোথাও কোনো আশ্রয় না পেয়ে অবশেষে শুক্রবার তারা বাড়ি ঘর ছাড়তে শুরু করে।
এ উচ্ছেদ প্রসঙ্গে মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, কোনো সভ্য দেশের পুলিশ এমন কাজ করতে পারে না। কোনো ধরণের আইনি প্রক্রিয়া না মেনে রাতের আঁধারে ‘গায়ের জোরে’ এভাবে ৪০ পরিবারকে রাস্তায় নামিয়ে দেয়া হলো।

তিনি আরও জানান, যশোরের এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার বিষয়টি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমানের দৃষ্টিতেও এসেছে। তিনি আইন বহির্ভূত এ উচ্ছেদ প্রক্রিয়া বন্ধ করতে এসপিকে চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু তা মানছে না পুলিশ।



এ ব্যাপারে যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আসাদুল হক জানান, তারা সরকারি ওই সম্পত্তির কাগজপত্র যাচাই করছেন। কাগজপত্র দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

আর যশোর জেলা পুলিশের মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর) মীর মোহাম্মদ সাফিন মাহমুদ উচ্ছেদের ব্যাপারে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তিনি বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, জমিটি পুলিশের। তাই জমিটি উদ্ধারে এই অভিযান চালানো হয়েছে। আদালতে মামলা চলাকালে উচ্ছেদ অভিযান বিধিবহির্ভূত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানিয়েছিলেন, দখলকারীরা জাল দলিল দেখিয়ে মামলা করেছেন। সরকারি স্বার্থে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছেন তারা।

মূলপাতা

আন্তর্জাতিক

এক্সক্লুসিভ